নাটোরের জনকখ্যাত বৃক্ষপ্রেমিক আফাজ উদ্দিন পাগলা আর নেই
নিজস্ব প্রতিবেদক, নাটোর : দেশ সেরা ওষুধী গ্রাম খ্যাত নাটোরের লক্ষ্মিপুর খোলাবাড়িয়া ওষুধী গ্রামের জনকখ্যাত বৃক্ষপ্রেমিক আফাজ উদ্দিন পাগলা আর নেই। রোববার রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঘুমের মধ্যে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্নাইলাহে রাজিউন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৮২ বছর। তিনি স্ত্রী, তিন মেয়ে ও পালিত এক ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রহী রেখে গেছেন।
আফাজের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তাকে এক নজর দেখার জন্য অসংখ্য ভক্ত, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, কৃষি কর্মকর্তা, গণমাধ্যম কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ভিড় করেন তার বাড়িতে। আফাজ উদ্দিনের ছোট ভাই গিয়াস উদ্দিন জানান, আছর নামাজের পরপরই তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় ৪৫ বছর আগে নাটোর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া গ্রামে ঔষধি গাছের চাষ শুরু করেন আফাজ উদ্দিন। পাশাপাশি কবিরাজি চিকিৎসাও করেন তিনি। এলাকার সবাই তাকে বলে আফাজ পাগলা নামে চেনে। তিনি নিজে ঔষধি গাছ চাষ করেই থেমে থাকেননি, অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করেছিলে ভেষজ উদ্ভিদ চাষে। প্রথমে কেউ গুরুত্ব না দিলেও ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন,ভেষজ চাষ লাভজনক। পরে অন্যরাও চাষে যুক্ত হন। এভাবে ঔষধি গাছের চাষ বাড়তে থাকে খোলাবাড়িয়া গ্রামে। মিসরি দানা, ভূঁইকুমড়া, আলকুচি, তুলসি, হরতকি, আমলকি, বহেরা, বাসক, ঘৃতকাঞ্চন, শতমূলী, শিমুল, অশ্বগন্ধাসহ প্রায় ১৪০ প্রকারের ঔষধী গাছের চাষাবাদ করা হয় এখানে। বর্তমানে এই গ্রাম সারা দেশে ঔষধী গ্রাম হিসেবে পরিচিত।
এ গ্রামে উৎপাদিত এসব গাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যান। ঔষধী গাছকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে ঔষধী বাজার। গ্রামবাসীর উৎপাদিত ভেষজ বাজারজাত করতে গড়ে উঠেছে সমবায় সমিতি। নাটোর শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ গ্রামের পথের দুই ধার ও জমিতে গাছ আর গাছ। কোনোটিই অমুল্য গাছ নয়, অনেক জটিল রোরে উপশম হয় এসব ভেষজ উদ্ভিদে। গাছের পরিচয়েই খোলাবাড়িয়াকে ডাকা হয় ‘ঔষধী গ্রাম’। ঔষধী গুণসম্পন্ন গাছের বদৌলতে বদলেছে গ্রামটির নাম। বদলে গেছে পুরো গ্রামবাসীর জীবনযাত্রা। বদলে গেছে তাদের চিন্তা চেতনা এবং কর্ম। এখন ঔষধী গাছেই ঘুরছে গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবারের অর্থনীতির চাকা। ‘ঔষধী গ্রাম’ এ নামে গ্রামটিকে পরিচিত করে তোলার নেপথ্যে রয়েছেন আফাজ উদ্দিন।
লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বাতেন ভূঁইয়া জানান, কৃষিক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে ‘চ্যানেল আই কৃষি পদক’ পেয়েছেন আফাজ পাগলা। এছাড়া স্থানীয়ভাবে পেয়েছেন বেশ কয়েকটি পুরস্কার। অবসরে তিনি একাকী থাকতে পছন্দ করতেন। আধ্যাত্মিক গান গাইতেন তিনি। এছাড়া নিজের কবিরাজি চিকিৎসালয় থেকে নানা রোগের চিকিৎসা সেবা দিতেন তিনি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন আসতেন তার কাছে চিকিৎসা নিতে।

No comments:
Post a Comment