যেভাবে প্রতারক চক্রের হাতে ভর্তিচ্ছুদের ফোন নম্বর!
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাবি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ¯্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষার্থীদের অর্থের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেয়ার কথা বলে মোবাইলে এসএমএস দেয়ার পেছনে বড় ধরণের প্রতারণা চক্রের হাত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভর্তিচ্ছুদের মোবাইল নাম্বার কিভাবে এ চক্রের হাতে গেল তা অনুসন্ধানে ‘টেকটিউনস’ নামের একটি সোশ্যল নেটওয়ার্কের নাম উঠে এসেছে। ভর্তিচ্ছুদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্র এ ভর্তি করিয়ে দেয়ার প্রচারণা চালাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
এর আগে, ভর্তি পরীক্ষা চলাকালীন ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠন ভর্তি পরীক্ষার ফল জানাতে ‘কুইক রেজাল্ট’ সার্ভিস চালু করেছিল। এর মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষায় প্রতারণা হতে পারে এমন অভিযোগ উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এটি বন্ধের পদক্ষেপ নেন। প্রক্টরের নির্দেশনা সত্ত্বেও এটি বন্ধ করেনি কেউই।
কয়েকজন ভর্তিচ্ছু জানান, কয়েকদিন আগে একটি অজ্ঞাত নাম্বার (০৩৫৯০৭৭৭৮৮৮) থেকে ভর্তিচ্ছু ও তাদের অভিভাবকের ফোনে একটি এসএমএস আসে। ইংরেজীতে লিখা ওই এসএমএসে উল্লেখ করা হয়, ‘যদি আপনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পান অথবা ভর্তি পরীক্ষায় আপনার মেধাক্রম দূরে হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সংক্রান্ত যে কোন সাহায্যের জন্য আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে ‘০১৮৬০৩৬৪৬৩৯’- এই নাম্বারে যোগাযোগ করুন।’
ভর্তিচ্ছুরা আরো জানান, এসএমএসে উল্লেখকৃত ওই নাম্বারে (০১৮৬০৩৬৪৬৩৯) যোগাযোগ করলে এক যুবক ফোন রিসিভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেয়ার ‘শতভাগ নিশ্চয়তা’ দিয়ে ভর্তিচ্ছুদের কাছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা দাবি করেন ওই যুবক। এর মধ্যে ১৫ হাজার টাকা অগ্রীম দিতে হবে এবং বাকি টাকা ভর্তি হওয়ার পর দিতে হবে বলে জানায় সে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যেসব ভর্তিচ্ছুর ফোনে ওই এসএমএস গেছে তারা প্রত্যেকেই ফল জানতে ‘টেকটিউনস’ নামের একটি সোশ্যল নেটওয়ার্কিং সাইটে ঢুকেছিলেন। রাবির ভর্তি পরীক্ষার ফল জানতে ওই সাইটে দেয়া একটি নাম্বারে তারা এসএমএস দিয়েছিলেন। এসএমএস দেয়ার ফলে ওই চক্রটি ভর্তিচ্ছুদের ফোন নাম্বার পেয়ে যায়। পরে প্রত্যেক ভর্তিচ্ছুর ফোনে ভর্তি করিয়ে দেয়ার নাম করে ওই এসএমএস দেয়া হয়েছে।
আনিসুর রহমান নামের এক ভর্তিচ্ছুর অভিভাবক বলেন, ‘আমার ছেলে রাবিতে তিনটি ইউনিটে পরীক্ষা দিয়েছিল। কয়েকদিন আগে ‘সি’ ইউনিটের ফল জানতে ইন্টারনেটে সার্চ দিই। সেখানে ‘টেকটিউনস’ নামের একটি সাইটে রাবির ভর্তি পরীক্ষার ফল সম্পর্কিত একটি লিংক দেখতে পায়। ওই সাইটে গিয়ে দেখি ফল জানতে এসএমএস করার জন্য বলা হয়েছে। আমি আমার ছেলের নাম, রোল ও ফোন নম্বর লিখে সেখানে দেয়া একটি নাম্বারে (৬৯৬৯) এসএমএস করি। ফিরতি এসএমএসে ফল জানানো হয়। এরপর গত শুক্রবার বিকেলে রাবিতে ভর্তি করিয়ে দেয়ার কথা বলে ওই এসএমএসটি আসে। এসএমএসে উল্লেখিত নাম্বারে (০১৮৬০৩৬৪৬৩৯) আমি ফোন দেই। ওপাশ থেকে এক ব্যক্তি জানায় তাকে ৩২ হাজার টাকা দিলে আমার ছেলেকে রাবিতে ভর্তি করিয়ে দিবে।’
সাইমুন সরদার নামের এক ভর্তিচ্ছু বলেন, ‘আমি রাবিতে ‘এইচ’ ইউনিটে পরীক্ষা দিয়েছি। ‘টেকটিউনস’ নামের সাইটে দেয়া নাম্বারে ফল জানতে আমি এসএমএস দিয়েছিলাম। শুক্রবার সকাল ৪টা ৫৫ মিনিটে আমার ফোনে ওই নাম্বার থেকে এসএমএস আসে। আমার এক বান্ধবীকেও একই এসএমএস দেয়া হয়েছে।’
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মোট চারজন ভর্তিচ্ছুর নাম জানা গেছে যাদের ফোনে ওই এসএমএস পাঠানো হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই ওই সাইটে দেয়া নাম্বারে ফল জানতে এসএমএস করেছিলেন।
ওই চারজন ভর্তিচ্ছু জানান, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা অন্য কাউকে ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত কোন বিষয়ে সাহায্যের জন্য নিজেদের ফোন নম্বর দেননি। ভর্তি করিয়ে দেয়ার নামে ইংরেজীতে যে এসএমএসটি এসেছে ঠিক এমনই একটি লেখা ওই সাইটে রয়েছে।
‘টেকটিউনস’ নামের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ঢুকে দেখা যায়, ভর্তিচ্ছুরা ফল জানতে যেভাবে এসএমএস করার কথা বলেছেন ঠিক এমনই একটি পোস্ট সেখানে রয়েছে। ওই পোস্টে বলা হয়েছে- ‘সহজ ও দ্রুততম সময়ে ফল পেতে ভর্তিচ্ছুর নাম, ইউনিটের নাম, রোল নম্বর ও ফোন নম্বর লিখে ৬৯৬৯ নম্বরে এসএমএস করন।’
ভর্তিচ্ছুদের ফোনে পাঠানো এসএমএস এর অনুরূপ একটি লেখা সেখানে রয়েছে- ‘যাদের রেজাল্ট খারাপ হয়েছে কিংবা মেরিট পজিশন অনেক দূরে তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।’
‘টেকটিউনস’ সাইটে ওই পোস্টদাতার নাম রয়েছে ‘আরজে রাজিব’। পোস্টদাতার পরিচয়ের জায়গায় বগুড়ার রেডিও মুক্তির আরজে লেখা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেডিও মুক্তির স্টেশন ম্যানেজার আরিফ বলেন, ‘আমাদের রাজিব নামের কোন আরজে নেই। আগেও এই নামে কোন আরজে ছিল না।’
ভর্তিচ্ছুদের পাঠানো এসএমএসে উল্লেখিত নম্বরে (০১৮৬০৩৬৪৬৩৯) ভর্তিচ্ছু সেজে যোগাযোগ করা হলে ওই ব্যক্তি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে তার ফোনে এসএমএস দিতে বলে। এসএমএসে কথা বললে সে ভর্তির কথা বলে একইভাবে ৩৫ হাজার টাকা দাবি করে। তার পরিচয় জানতে চাইলে সে কোন উত্তর দেয়নি। পরে তাকে ফোন দিলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি ইতিমধ্যে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে জানানো হয়েছে। খোঁজ নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

No comments:
Post a Comment